আমার বন্ধুর বোন

বেশ কয়েক দিন থেকেই দেখছি, রাশাদ আমাকে এড়িয়ে চলছে৷ কিন্তু কেন? আমি তার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না৷ ১২টায় আমাদের কোনো ক্লাস থাকে না৷ সেই সময়টায় সাধারণত আমরা ক্যানটিনে আড্ডা দিই৷ সেই আড্ডার স্থায়ী মেম্বার ছিল রাশাদ৷ শুধু তা-ই নয়, সে আমার ছোটবেলার বন্ধুও বটে৷
আজও রাশাদ এসেছিল ক্যানটিনে৷ কিন্তু আলাদা টেবিলে বসেছিল৷ বারকয়েক আমার দিকে তাকিয়েছে৷ আমিও না-দেখার ভান করেছি৷ ব্যাপারটা খুলে বলি আরমানকে৷ সে সব শুনে বলে, ‘আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের কর৷ তার পর সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে৷’ আমি বলি, ‘খুঁজে বের করার কী আছে৷ আমার তো অসংখ্য মেয়ে বন্ধু৷’ আরমান বলে, ‘ওসব না৷ বিশেষ একজন আছে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ সে হয়তো তোকে বাসে৷ তুইও তাকে বাসিস৷’
উপমার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘এই, তুই কি আমাকে বাসিস?’
উপমা চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, ‘বাসিস আবার কেমন কথা?’
আমি আরমানকে দেখিয়ে বলি, ‘এটা আমার কথা নয়৷ আরমান বলেছে৷’
‘তোতা পাখির মতো পরের বুলি না বললেই পারিস৷’
উপমার কথা শুনে আরমান হাসে৷ বলে, ‘বাসিস কথাটা খারাপ কী? তুই কি আমাকে বাসিস?_শুনতে কী সুন্দর লাগে৷’
উপমা কোনো উত্তর খুঁজে পায় না হয়তো৷ সে খালি চায়ের কাপে গ্লাসের পানি ঢালতে থাকে৷ আমি বলি, ‘পৃথিবীতে কিন্তু পানির দাম সবচেয়ে বেশি৷ ধরো, ফারাক্কা৷ ফারাক্কা মানে পানি৷ টিপাইমুখ মানে পানি৷ পানির জন্য ঝগড়া৷ পানির জন্য যুদ্ধ৷’
আমার কথা শুনে গ্লাসের তলানিতে যতটুকু পানি ছিল, উপমা সেটা আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে টেবিল থেকে উঠে যায়৷
আরমান আমাকে বলে, ‘উপমা কিন্তু তোকে বাসে৷’
‘কীভাবে বুঝলি?’
আরমান বলে, ‘আমার একটা তৃতীয় নয়ন আছে৷ সেটা দিয়ে আমি সব দেখতে পাই৷’
আমি বলি, ‘আমি তোকে বলেছি বুঝতে পারার কথা, দেখার কথা তো বলিনি৷’
আরমান পণ্ডিতের মতো বলে, ‘তৃতীয় নয়ন থাকলে গেস করাও সহজ হয়৷ অনুমান সঠিক হয়৷’
তার এই পণ্ডিতি আমার ভালো লাগে না৷ আমি প্রসঙ্গ হালকা করার জন্য বলি, ‘তোর চশমার তিনটি ঘর দরকার; যেহেতু তোর নয়ন তিনটি৷ অর্ডার দিয়ে একটি চমশার ফ্রেম বানিয়ে নিস৷ দেখতে পাবি ভালো৷’
আমি তার হাতের মুঠোয় যেন একটি বিষয় গুঁজে দিলাম৷ সে এবার আরও পণ্ডিতি ঝাড়তে শুরু করে৷ বলে, ‘আরে মূর্খ, তৃতীয় নয়নের কোনো চশমা লাগে না৷ অন্ধেরও তৃতীয় নয়ন থাকতে পারে৷’
আমি কিছু না বুঝেও বললাম, ‘বুঝলাম৷’ আরমান খুশি হয়ে বলল, ‘গুড৷’
আমি বলি, ‘মেয়েটিকে কীভাবে খুঁজে বের করব বল৷’ সে বলে, ‘আরে খোঁজাখুঁজির কী আছে৷ আমি বলতে চেয়েছি, প্রত্যেক ঘটনার মধ্যেই একটি মেয়ে লুকিয়ে থাকে৷ অথবা একটি মেয়েকে কেন্দ্র করেই অনেক কিছু ঘটতে পারে৷’ আরমানের কথাগুলো আমার খুবই মনে ধরে৷
বলি, ‘মেয়েটা কি উপমা?’
আরমান আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমি জানি, তুমি বন্ধু উপমার প্রতি একটু একটু দুর্বল৷ উপমাও তোমার প্রতি দুর্বল৷ কিন্তু এসব মনে রেখো না৷ তবে এই দুর্বলতার সুযোগ নাও৷ কাজে লাগাও৷’
আমি আরমানের কথার মধ্যে কেমন দুই-নম্বরি উপদেশের গন্ধ পাই৷ বলি, ‘ঠিক আছে, ভেবে দেখি৷’
ঠিক সেই সময় সানজানা ফোন করে৷ সানজানা হচ্ছে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাশাদের ছোট বোন৷ রাশাদের কথা শুরুতেই বলেছি; যে আমাকে কয়েক দিন ধরে এড়িয়ে চলছে৷
ফোনে সানজানা বলে, ‘মিঠু ভাইয়া, আমার খুব বিপদ৷ বাসায় একটু আসবে? তুমিই পারো আমায় এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে৷’ কথা শুনে আমি প্রায় দৌড়ে ছুটে যাই গেটের দিকে৷
ক্যানটিন থেকে বের হওয়ার সময়ই রাশাদ আমার সামনে এসে দাঁড়ায়৷ বলে, ‘তোর সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে৷’ সে আমাকে প্রায় টেনে নিয়ে যায় তিন তলার বারান্দায়৷
আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘আমার যোগ্যতা থাকলে আমি আজই তোকে খুন করতাম৷’ এ কথা বলেই সে কাঁপতে থাকে৷
আমি বলি, ‘কী হয়েছে রাশাদ, খুলে বল?’
‘কী হয়েছে মানে? তুই জানিস না? সানজানার পেটে বাচ্চা, আর তুই জানিস না?’
রাশাদের কথা শুনে আমার মাথা ঘুরে হয়ে যায়৷ ওর দিকে তাকিয়ে আমি বলি, ‘মাথা ঠান্ডা কর প্লিজ৷ আমি এক্ষুনি তোদের বাসায় যাচ্ছি৷ সানজানা ফোন করেছে৷’
আমার কথা শুনে রাশাদের মাথায় যেন আগুন চড়ে যায়৷ সে আমাকে বলে, ‘তুই কি সানজানাকে বিয়ে করবি?’
বলি, ‘বিয়ের প্রশ্ন আসছে কেন?’
কথা শুনে রাশাদ ঠাস করে আমার গালে একটি চড় বসিয়ে দেয়৷ চড় খেয়ে আমি তার চোখের দিকে তাকাই, দেখি তার চোখ ভিজে উঠছে৷ আমি রাশাদকে দোতলায় রেখে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নামি৷ একটি ইয়েলো ক্যাব নিয়ে ছুটে যাই রাশাদদের বাসায়৷
রাশাদের যে ভেজা ফ্যাকাশে চোখ দেখে এলাম, সেই একই রকম ভেজা চোখ সানজানার৷
সানজানা আমাকে গড়গড় করে সব কথা খুলে বলে৷ আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে৷ এত কিছু ঘটে গেছে সানজানার জীবনে!
বিশ মিনিট পরেই আমি বের হয়ে যাই ওদের বাসা থেকে৷ রাশাদদের বাসা থেকে প্রায় হাঁটা-পথে আরমানদের বাসা৷ আলীশান বাড়ি তাদের৷ সেই বাড়িতে পেঁৗছেই আমি সোজা আরমানের রুমে চলে যাই৷ বেশ কয়েকজন বন্ধু নিয়ে সে আড্ডা মারছে৷ তাদের একজনকেও আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্ট মনে হলো না৷
আমাকে দেখে সে খুশি হয়নি৷ আরমান বলল, ‘কি রে, মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছিস?’
একটি ছেলে এল তার দিকে৷ হাতে একটি সিরিঞ্জ৷ আরমানের হাতে সিরিঞ্জটি ঢুকিয়ে দিল৷
আরমান নেশা করে, আমি জানতাম না৷
সে আমার দিকে চোখ তুলে বলল, ‘মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছিস?’
‘হঁ্যা, পেয়েছি৷ আরমান, আমি তোর সঙ্গে একটু আলাদা কথা বলতে চাই৷’ আরমানের হাতের ইশারা পেয়ে তার বন্ধুরা পাশের রুমে চলে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গে আরমানের পা জড়িয়ে ধরলাম৷ বললাম, ‘দোস্ত, তুই সানজানাকে বিয়ে কর৷ তা না হলে তো ওর আত্মহত্যা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না৷ আর সেজন্য তুই-ই দায়ী হবি৷’
আরমান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সানজানাকে বিয়ে করলে তো অনেককেই বিয়ে করতে হয়৷ তা কি সম্ভব? তা ছাড়া একজন কেরানির মেয়েকে কী করে বিয়ে করি বল? স্ট্যাটাস বলে তো একটি কথা আছে না, কি!’
আমি বলি, ‘তোর তো একটি তৃতীয় নয়ন আছে৷ সেই চোখ দিয়ে সানজানার অবস্থাটা দেখার চেষ্টা কর৷’
আরমান বলে, ‘নেশা করার সময় জ্ঞান দিবি না৷’ তার চোখ-মুখ দেখে কেমন অচেনা লাগে তাকে৷ বলে, ‘চরণ ছেড়ে দে দোস্ত৷ ওই, তোরা এই ঘরে আয়৷’
পাশের ঘর থেকে তার বন্ধুরা চলে আসে৷ আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সম্ভব না, দোস্ত৷ এবার আসতে পারিস৷’ আমি মনে মনে বলি, ‘যোগ্যতা থাকলে আমি তোকে খুন করতাম৷’ আরমান আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে৷ বলে, ‘দোস্ত, মহাপুরুষ হওয়ার একটি সুযোগ হাতছাড়া করিস না৷ তুই নিজেই কবুল বলে ফেল৷’
আমি ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়াই৷ ভেতর থেকে ভেসে আসে হো-হো হাসির শব্দ৷
বাসায় ফিরি৷
সারা রাত আমার ঘুম হয় না৷ ফজরের আজানের শব্দ ভেসে আসে চারদিক থেকে৷ সানজানাকে বলে এসেছিলাম, আরমানকে রাজি করাতে পারলে ওদের বাসায় যাব৷
আমার কানে বাজে আরমানের কথা৷ ‘তুই নিজেই কবুল বলে ফেল৷’
আমি সানজানাকে ফোন করি৷ ফোন বাজছে কিন্তু ধরছে না৷ নিশ্চয় ঘুমিয়ে আছে সে৷ আমি ফোন করি রাশাদকে৷ সরাসরি বলি, ‘রাশাদ, আমি সানজানাকে বিয়ে করতে চাই৷ আজই৷’
ওপাশ থেকে ভেসে আসে রাশাদের বুকফাটা কান্নার শব্দ৷ রাশাদ বলে, ‘তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আয়, সানজানা আত্মহত্যা করেছে৷’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


+ seven = 16