আমি ক্লাস সিক্স

পড়ার টেবিল থেকে আম্মুকে দেখা যাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আম্মু বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে দিতে আম্মু বলে, ‘বাপী, তুই কি এক ঘণ্টার জন্য বাসায় একা থাকতে পারবি না?’

‘আম্মু, আমি এখন ক্লাস সিক্স। আমাকে বেবি ভাবছ কেন? খুব পারব।’

আম্মু হাসে।
তুই তাহলে বড় হয়েছিস?
নিশ্চয়। আমি এখন অনেক বড়। লম্বায় বাবার সুমান।
আম্মু মিটমিট করে হাসে এবার। বলে, সুমান না বাবা। বল, সুমান।
নিজেকে দেখতে দেখতে আম্মু আবৃত্তি করেন।
আজিএ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আধারে
প্রভাত পাখির গান…
আর সেই দৃশ্য বাপী লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। এত সুন্দর মা তার। স্কুলের বন্ধুরাও বাপীকে বলে, ‘তোর মা এতো সুন্দর ক্যানরে? বন্ধুদের কথা শুনে বাপী কেন যেন লজ্জা পেয়ে যায়।
বাপীর পড়ার টেবিলের সামনে এসে মা বলে, ‘স্রেফ এক ঘণ্টা বাবা। যাব আর আসব।’
বরাবরের মতোই মা তাকে জড়িয়ে ধরে। গালে চুমু খায়। বলে, ‘দরোজাটা লাগিয়ে দাও। মোবাইলটা রইল। কোনো কিছু হলে ফোন দিও।’
বাপীরা থাকে লালমাটিয়া ডি ব্লকে। আম্মু গেল জাপান গার্ডেন সিটির আগরা শপিং মলে। খুব দূরে কই। বাসা থেকে পঁচিশ টাকা রিকশা ভাড়া মাত্র।
আম্মুর লিফটে না ওঠা পর্যন্ত দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকে বাপী। লিফটে ঢুকে যাওয়ার পরই কেমন একা একা লাগে তার। ছয়তলা বাড়ি। বাপীরা ছয়তলাতেই থাকে। ছয় তলার সমান উচ্চতার একটি নারকেল গাছ। গাছটি প্রায় তাদের বাসা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটির জন্যই বাপীর ঘরটা কেমন অন্ধকার হয়ে থাকে।
বাপীর কাজিন তুবা বেড়াতে এসেছিল রোববার। তুবা বলে, ‘তোর ঘরটা কেমন ভূতুরে ভূতুরে। এমন ধরনের ঘরে ভূতের গল্প কিন্তু বেশ জমে!’
বাপীর এখন তুবার কথাটা কানে বাজছে। নারকেল গাছে একটি কাক বসে আছে। এটা বাপীর চেনা কাক। কাকটার একটা ঠ্যাং ভাঙা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। সেটা বাপীর দিকে তাকিয়ে বলল, কা ক কা ক।
চেনা কাকের শব্দ শুনে কেমন গা ছমছম করে ওঠে তার। হঠাৎ ঘরের দরোজাট দরাম শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায় বাপী দৌড়ে যায় সেদিকে।
কে? কে?
‘কেউ না। বাতাস।’ নিজের এই কথাটাই কেন মনে হয় অন্য কারও কথা। অন্য কেউ কথা বলছে।
দরোজার সিটকিনিটা ভালো করে লাগিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে বাপী। বেশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বাপী বুঝতে পারছে আকাশে মেঘ করেছে।
কলিংবেল বেজে ওঠে। সেটার শব্দে বাপীর বুকটা ধরফর করে ওঠে যেন। সে দরোজা না খুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।
অচেনা একটা লোক জানালার সামনে মুখ এনে বলে, ‘ভাইজান, জানালাটা লাগান, ঝাড়– দিমু। ঘরে ধুলা ঢুকবো। আমি নতুন জয়েন দিছি। কিলিনার।’
জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে বাপীর মনে হয়, এটা বন্ধ করলেই তার বেশি ভয় লাগবে। কিন্তু লোকটা বাইরে থেকে জানালার গ্লাসটা টেনে দেয়। জানালাটা বন্ধ হয়ে যায়।
আকাশে গুডুম গুড়–ম শব্দ হয়। নারকেল গাছের কাকটা উড়ে পুব দিকে চলে যায়।
ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। দুমধাম ঘরের জানালাগুলো শব্দ করে ওঠে। বাপী দৌড়ে যায় নিজের পড়ার ঘরে। জানালাটা বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার হাত কাঁপতে থাকে। পিছনে যেন কারও পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। বাপী স্থির হয়ে দাঁড়ায়। পিছনে খিলখিল হাসির শব্দ। ‘বাপী তুই ভয় পাচ্ছিস? আমি বলেছিলাম না। তোর ঘরে ভূতের গল্প জমে ভালো। তুই, শুনবি ভূতের গল্প?
বাপী কাপতে কাঁপতে বলে, তু তু তু তুবা, তুই ঘরে আসলি কেমন করে, দরজাতো বন্ধ?
ও তাহলে চিনতে পেরেছিস?
‘হ্যাঁ পেরেছি, তুই তুবা’ একথা কলেই বাপী ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু কই। তুবাÑনেই। কেউ নেই।
টেবিলের ওপর মোবাইলটা বেজেই চলেছে। আননোন নাম্বার। ধরবে ধরবে করেও ধরছে না সে। হাত কাঁপছে বাপীর। বুকে অনেক সাহস সঞ্চয় করে ফোনটা রিসিভ করে।
ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে ওঠে তুবা। ‘শোন, আন্টির সঙ্গে দেখা হয়েছিল আগরায়। তুই নাকি বাসায় একা আছিস। কি রে কথা বলছিস না কেন? শোন, ভূতটুত দেখে ভয় পাসনে আবার। আর ভয় পেলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিবি। কথা বলছিস না কেন? বোবা কোথাকার!
সত্যি বোবা হয়ে গেছে বাপী। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না।
ভেতরের ঘর থেকে একটি লোক এসে দাঁড়ায় তার সামনে। ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমি তোমার বাবার বাবা। মানে তোমার দাদা। তোমার জšে§র আগেই আমি পৃথিবী থেকে পালিয়েছি। দেখে তো ওই ছবিটির সঙ্গে আমার চেহারার মিল আছে কিনা।’
বাপী দেয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে তাকায়। সত্যিই ছবিটার সঙ্গে হুবহু মিল আছে তার।
কই, আস দেখি ক্লাস সিক্স। তোমার কেমন সাহস। দেখি সেটা, বাপী এসে দাদুর সামনে দাঁড়ায়।
দাদু বলে, কি রে তুই না মাকে বলেছিস বড় হয়েছিস। ক্লাস সিক্স-এ পড়িস? তাহলে ভয় পাচ্ছিস কেন?
জানালায় কেউ খটখট করে। বাপী জানালা খুলতে যেতে পারে না। সেই ক্লিনার। দাঁত বের করে জানালা দিয়ে মুখ বাড়ায়। ‘কই, কেউ নাই দেখি। পিচ্চি পোলাডা গেল কই? ক্লিনারের কথা শুনতে পায় বাপী। কিন্তু সেদিকে এগিয়ে যেতে পারে না সে। ঠিক ওই মুহূর্তেই দরোজায় কলিং বেল। বেলটায় অচেনা একটি পাখির ডাক। বাপীর আম্মু কলিং বেল বাজিয়েই যাচ্ছে। দুই হাতে তার শপিং ব্যাগ। হঠাৎ বাপীর আয়নার দিকে চোখ পড়ে। সে দেখে আয়নার ভিতর আম্মু হাসছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন আম্মুকে দেখা যায়। ঠিক তেমনি। বাইরে থেকে আম্মুর আবারও কলিং বেল।
ক্লিনার লোকটা আম্মুর সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘আমি আপনার দরোজটা খুলে দিতে পারি। চুরচোট্টা ছিলাম তো।এইটা আমার কাছে তো দুধভাত।’
আম্মু বলে, ‘দুধভাত টুটবাত বুঝিনা। তাড়াতাড়ি দরোজা খোল।’ জানালা দিয়ে গাত বাড়িয়ে সহজেই দরজা খুলো ফেলে সে। দরোজা খোলার পর আম্মু ঘরে ঢুকেই দেখে বাপী ড্রেসিং টেবিলের সামনে মেঝেয় পড়ে আছে।
আম্মু আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ঘরে বাপীকে। চোখের সামনে ড্রেসিং টেবিলের ওপর দেখে একটি কাগজ। তাতে লেখা, ‘আজ তোমার মৃত্যুবার্ষিকী দাদু, তুমি ভালো থেকো। Ñবাপী।
আম্মু দেখে, দেওয়ালে টাঙানো বাপী দাদুর ছবিটা নিচে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। যেন তিনি তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
বাপীকে জড়িয়ে ধরে আম্মু কেঁদেই চলেছেন। কেমন ভয় ভয়ও লাগছে তার। হঠাৎ চোখ খুলে বাপী বলে, ‘এতো অস্থির হইও না তো আম্মু। এতো ভয় পেলে কি চলে? আমি অনেক বড় হয়েছি। আমি ক্লাস সিক্স। তোমার ভয় কিসের। তাছাড়া এতোক্ষণ দাদু আমার সঙ্গেই ছিলেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


seven × = 7