ক্যাম্পাসের কবি

আমরা প্রায়ই শুনতাম, রাতুল সদরঘাটে যায়।
জেসমিন বলল, ‘কেন,  ঘোলা পানি দেখতে?’
ইকবাল বলে, ‘হ্যাঁ, ক্যাম্পাসে তো ঘোলা পানি নেই, তাই যায়।’ বুবন কথা শুনে খিলখিল করে হাসতে শুরু করে। আমি একটু গম্ভীর হয়ে বলার চেষ্টা করি, ‘ও আসলে কবিতা লেখে তো, তাই। নদীটদী দেখতে যায়।’
এতক্ষণ চুপচাপ ছিল লুবা। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ওকে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ক্লাস বইটি পড়তে বলিস। কবিতা লিখতে কোথাও যেতে হয় না। ঘরে বসেই কবিতা লেখা যায়। আর দেখতেই যদি হয়, আমাকে দেখুক। আমি এই ক্যাম্পাসের সেরা সুন্দরী। কবিদের তো সুন্দর নারীদের প্রতি দুর্বলতা বেশি থাকে।’
লুবার কথা শুনে জেসমিন উঠে দাঁড়ায়; বলে, ‘যাই। আমার একটু তাড়া আছে।’
লুবা জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘মেয়েটা আমাকে কেন জানি সহ্যই করতে পারে না।’
‘আমরা কিন্তু তোকে খুব সহ্য করতে পারি। আমরাও কিন্তু কবিদের মতো। সুন্দরীদের প্রতি আমাদের বেশ দুর্বলতা,’ আমি বলি।
ইকবাল বলে, ‘কথায় কথায় আমাদের জড়াছিস কেন? তোর দুর্বলতা আছে তা-ই বল।’
লুবা হাসে। ইকবালের দিকে তাকায়। আবার হাসে। বলে, ‘আমার দিকে কে কীভাবে তাকায়, সেটা কিন্তু আমিই বেশি ভালো করে জানি। কি রে, মুখ ঘুরিয়ে নিলি কেন? আমাকে তাকিয়ে দেখ। তোদের বলে রাখি, আমাকে দেখতে হলে সরাসরি দেখবি। লুকিয়ে দেখবি না।’
আমি বলি, ‘ও আচ্ছা। ইকবাল তাহলে তোকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে।’
‘শুধু ইকবাল দেখে না, তুইও দেখিস,’ লুবা আমার দিকে তাকিয়ে বলে।
বুবন এতক্ষণ নীরব ছিল। আমাদের এতক্ষণের কথাবার্তা কিছুই শুনতে পায়নি যেন। বলে, ‘আমাদের পরবর্তী ক্লাসের সময় হয়ে গেছে কিন্তু।’
লুবা বলে, ‘ক্লাস ছাড়া তোর পৃথিবীতে কিছু আছে নাকি?’
বুবন কী বলবে কোনো উত্তর খুঁজে পায় না।
বুবনটা এমনই। কথা বলে কম। কথার পিঠে কথা বলে কাউকে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে, সেদিকেও এগোতে পারে না।
লুবা বুবনের দিকে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলে, ‘তুই আসলে ছেলে, না মেয়েÑ সত্যি করে বল তো?’ কথা শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠি।
তবে আমি লক্ষ করি, বুবনের চোখমুখ কালো হয়ে গেছে। বুবন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘তোমাদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা বলাই ঠিক না।’
লুবা বুবনের হাত টেনে ধরে বলে, ‘আমার কথার উত্তর দিয়ে যা।’
বুবন উত্তর দিয়ে বলে, ‘তুই কি চাস আমি প্যান্ট খুলে প্রমাণ করি, ছেলে না মেয়ে?’
বুবনের ধরন দেখে আমরা হো হো করে হেসে উঠি। বুবন হনহন করে হেঁটে যায়। আর উল্টোদিক থেকে আসতে থাকে আমার ক্যাম্পাসের কবি নিশাত আহমেদ রাতুল।
রাতুল এসে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। চোখ তুলে লুবা বলে, ‘আমার পাশে বসবে কি না, তা-ই ভাবছ?’
রাতুল বলে, ‘তুমি আসলেই বড় হলে মনোবিজ্ঞানী হতে পারবে।’
‘আমি আর কত বড় হব, দাদা ঠাকুর। আমার মাথা ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমাকে তিন প্রহরের বিল দেখতে নিয়ে যাবে?’
রাতুল কবিতা শুনে নেচে উঠে কেন। ‘আরে সুনীলের এই কবিতাটা পড়া আছে তাহলে?’ রাতুল বলে।
এ কথায় লুবা খনিকটা আহত হয়। বলে, ‘ও তুমি ভাবছ, শুধু তুমিই কবিতার ইজারা নিয়েছ?’
‘ছি ছি। কবিতার সঙ্গে ইজারা শব্দটা একদম যায় না,’ রাতুল লুবার দিকে তাকিয়ে বলে।
‘সেটা না যেতে পারে। তবে তুমি যে সদরঘাটের ঘোলা পানি চেখে দেখতে যাও, সেটা আমরা জানি।’
রাতুল রেগে বলে, ‘সদরঘাটে যাই সেটা ঠিক আছে। তাই বলে পানি চেখে দেখতে যাই, সেটি তোমাকে কে বলল?’
লুবা বলে, ‘শোনো রাতুল, সদরঘাটের বুড়িগঙ্গা দেখলে কোনো কবিতা বের হবে না। আমাকে দেখো। তরুণী গঙ্গাকে দেখো, দু-একটা ভালো কবিতা তোমার লেখা হয়ে যেতে পারে।’
রাতুল বলে, ‘সত্য কথা বললে, তোমার দিকে তাকালে আমার বুকটা যেন কেমন করে ওঠে। হাত থেকে বই-খাতা-ব্যাগ সবকিছু পড়ে যেতে চায়।’
রাতুল কেমন নির্লজ্জের মতো লুবার দিকে তাকিয়ে থাকে। লুবাও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, ‘তোমার এই তাকানোটাকে আমি ভীষণভাবে অনুভব করি।’
প্রায় তিন মাস পরের ঘটনা। পুরো ক্যাম্পাসে প্রচার পেয়ে যায় লুবার সঙ্গে ক্যাম্পাসের কবি রাতুলের প্রেম জমে উঠেছে। এতে ক্যাম্পাসের অনেক তরুণের বুক ভেঙে যায়। কিন্তু একটা কথা সত্য, যাদের বুক ভেঙে গেছে তাদের কেউই কখনো লুবাকে প্রপোজ করার সাহস পায়নি।
লুবা যতই সুন্দরী হোক না কেন, ছেলেরা যেন তাকে ভয় করে। আর মেয়েরা তাকে অপছন্দ করে।
কবি রাতুলের ভীষণ ঘোরার শখ। সময় পেলেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ইদানীং নাকি তার ঘোরার সঙ্গী হয়েছে লুবা। ধানমন্ডি লেকে, জগন্নাথ ক্যাম্পাসে লুবা গাড়িতেই আসা-যাওয়া করত। এখন সে গাড়িতে আসে, তবে বাসায় ফেরে রাতুলের সঙ্গে রিকশায়।
বুবন একদিন লুবাকে বলেই ফেলল, ‘তুই নাকি ক্যাম্পাস থেকে রিকশায় বাসায় যাস। গাড়ি থাকতে এত দূরের পথ রিকশায় যাওয়ার দরকার কী?’
লুবা হাসে। বলে, ‘রিকশায় যত দূর, তত মজা। অবশ্য তুই এসব বুঝবি না। তুই তো আবার প্রেমট্রেমে বিশ্বাসী না।’
লুবার প্রেমে পড়ার ঘটনায় অনেকেই ক্ষিপ্ত, সেটা বোঝা যায়।
সেদিন শহীদ মিনারের নিচে বসে একজন বলছিল, ‘শালার কবি। ওর কবিতা লেখা আমি বন্ধ করে দেব। কবিতা লেখে অথচ একটা কবিতাও পত্রপত্রিকায় ছাপাতে পারল না।’
রোববার সন্ধ্যায় আমি টিএসসিতে ছিলাম। আমাদের নাটকের দলের সেদিন রিহার্সেল ছিল। হঠাৎ খবর আসে, রাতুল হাসপাতালে। কী হয়েছে?
সন্ত্রাসীরা নাকি তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে।
আমি ফোন করি বুবনকে। বুবন টেলিফোনে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ওর কান্না শুনে আমার প্রথম হাসিই পাচ্ছিল। আমি ঘটনাটা জানার চেষ্টা করি।
বুবন বলে, ‘চানখাঁরপুল এলাকা দিয়ে ওরা দুজন হেঁটে যাচ্ছিল, আশপাশের লোকজন লুবাকে দেখে অশ্লীল কথা ও অশ্লীল অশ্লীল ভঙ্গি করে। আর যাবে কোথায়, আমাদের ক্যাম্পাসের কবি রাতুল তাদের দুজনকে ধরে কিলঘুষি মারতে থাকে। কবিকে কি তারা আর ছাড়ে। পাঁচ-ছয়জন এসে রাতুলকে বেদম পেটাতে শুরু করে। লুবা, যার মুখে কোনো কথাই আটকায় না এই দৃশ্য দেখে বোবা হয়ে যায় যেন।’
আমি ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে সে।
আমি কর্তব্যরত ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। তিনি বলেন, মাথার আঘাতটা গুরুতর। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
লুবাও আছে। সঙ্গে তার ছোট মামা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘কারা করল এটা?’ লুবার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে।
‘একজনকে আমি চিনেছি। কিন্তু ওর নাম জানি না। ওই ছেলেটাই রাতুলের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করেছে। তারপরই ও ঢলে পড়ে যায়।’
আমার চোখে ভেসে ওঠে ক্যাম্পাসের সেই ছেলেটির কথা। যে বলেছিল, ‘শালার কবি। ওর কবিতা লেখা আমি বন্ধ করে দেব। ওই ছেলেটি না তো। ওর নাম তো হাসান।’
বুবন ছুটে আসে। সেও কাঁদছে। লুবার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোর কান্না থামা। তোর কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’
লুবা তার ছোট মামার সঙ্গে রাত ১০টার দিকে চলে যায়।
আমি আর বুবন রাত ১২টার দিকে দুজনের বাসার দিকে যাই।
রিকশা থেকে বুবনকে ফোন করি, ‘তুই হাসান নামে কাউকে চিনিস।’
‘হ্যাঁ, চিনি ওই শালা তো বদমাইশ। লুবার সঙ্গে প্রেম করতে চায়। ও তো আমার ভার্সিটিতে পড়ে না।’
‘কোথায় পড়ে?’
‘কোথায় পড়ে, তা তো জানি না। পড়ে কি না সেটাও আমার সন্দেহ।’
‘অনেক রাতে ঘুম ধরে আমার। শুধু রাতুলের মুখটা ভেসে ওঠে আমার সামনে। কানে বাজে ডাক্তারের কথা। আঘাত গুরুতর…।’
ভোরবেলা বুবনের ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙে আমার। ও প্রান্ত থেকে সুর তুলে কাঁদছে বুবন।
‘তুই কি আজকের পত্রিকা দেখেছিস?’
‘কেন কী হয়েছে?
বুবনের কান্না আরও বেড়ে যায়।
‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে…।’
আমি থাকি ছয়তলায়। তখনো বাসায় পত্রিকা দেয়নি। ছয়তলা থেকে প্রায় দৌড়ে নেমে যাই। নিচে আবার দৌড়াতে থাকি গলির মোড়ে পত্রিকার দোকানে।
প্রায় সব পত্রিকায়ই ছাপা হয়েছে। সহপাঠিনীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় নগরে এক তরুণ খুন।
পত্রিকা নিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে অছি, খেয়াল নেই। পত্রিকাওয়ালা বলে, ‘ভাই, বাসায় গিয়া মন দিয়া পড়েন না। দোকানের সামনে থিকা সরেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


1 + one =