মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

দন্ত্যস রওশনের ছোট কবিতাগুলোকে তিনি অণুকাব্য বলেন। আমার ধারণা, নামকরণটি যথার্থ হয়েছে। অণু হচ্ছে পদার্থের সবচেয়ে ছোট রূপ, যেখানে তার বৈশিষ্ট্যগুলো পুরোপুরি বজায় থাকে ঠিক তাঁর অণুকাব্যের মতোই। অল্প কয়েকটা শব্দ, অল্প কয়েকটা লাইনে দন্ত্যস রওশন এমনভাবে সাজিয়ে ফেলেন যে তার ভেতর কৌতুক, ব্যঙ্গ, তিরস্কার, ভালোবাসা, হতাশা কিংবা নিছক পাগলামো ঠেসে বোঝাই করা হয়ে যায়। কী বলতে চাইছেন সেটা বুঝতে কারও এতটুকু সমস্যা হয় না। আমি দন্ত্যস রওশনের অণুকাব্যের একজন বড় ভক্ত। আমি যতবার সেগুলো পড়েছি, ততবার তা শব্দ ব্যবহারের মিতব্যয়িতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কৌতুকবোধ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমার ধারণা, পাঠকদের কাছে তার অণুকাব্য খানিকটা নেশার মতো। একবার হাতে নিলে চট করে নামিয়ে রাখা যায় না। ‘আর একটা পড়েই রেখে দেব’ বলে নিজের অজান্তেই অনেকটা পড়ে ফেলতে হয়। দন্ত্যস রওশনের অণুকাব্যের সবচেয়ে বড় গুণটি অন্য জায়গায়। কয়েকটি পড়ে ফেললেই ছন্দটা কেমন জানি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। নিজের অজান্তেই তাঁর মতো করে অল্প কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করে বৃদ্ধিদীপ্ত কিছু কথা ছন্দে বেঁধে ফেলতে ইচ্ছে করে। তখন আমরা আবিষ্কার করি কাজটা অত্যন্ত দুরূহ। এ রকম দুরূহ একটা কাজ এত সহজে করে ফেলায় দন্ত্যস রওশনের কোনো তুলনা নেই। আমি তাঁর অণুকাব্যের দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

আনিসুল হক

আনিসুল হক

আজ থেকে বছর কয়েক আগের কথা, বইমেলায় গেলেই একজন ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো তরুণের দেখা মিলত। তিনি পকেট থেকে বের করে হাতে ধরিয়ে দিতেন ছোট পত্রিকা। আকারে খুব ছোট। এত ছোট আকারের পত্রিকা পৃথিবীতে আর বেরয় কি না সন্দেহ। সেই পত্রিকার নাম আমলকি। তাতে ছাপা হয় ছোট ছোট কবিতা। দুই পঙ্ক্তির, চার পঙ্ক্তির। সর্বোচ্চ ছয় পঙ্ক্তির। বেশির ভাগ কবিতাই তরুণ কবিদের। একটা-দুটো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মতো খ্যাতিমানের। সেই আমলকির অন্যতম সম্পাদক আমাদের এই দন্ত্যস রওশন। পত্রিকাটি ইদানীং দেখছি না। কিন্তু অনেক দেখেছি রওশনের অণুকাব্য। বিশেষ করে প্রথম আলোর ‘আলপিনে’।বর্তমানে রস + আলোতে। রওশনের অণুকাব্য, পড়ার সময় ফিক করে হেসে ফেলতেই হয়। এখানেই তাঁর অণুকাব্যের জয়। ইদানীং আরও অনেকেই অণুকাব্য লিখছেন। মনে হচ্ছে, এ ফরমটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অণুকাব্যের পত্রিকা সম্পাদনা ও অণুকাব্যের রচনার মাধ্যম এটিকে জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্ব রওশনই পাচ্ছেন। রওশন ও অণুকাব্য দীর্ঘজীবী হোক।

ইমদাদুল হক মিলন

ইমদাদুল হক মিলন

অণুগল্প লিখে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়েছেন বনফুল। বনফুলের প্রকৃত নাম শ্রীবলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। অণুকাব্য লিখে ইতিমধ্যে আমাদের কাছে বরণীয় হয়েছেন দন্ত্যস রওশন। বনফুলের সঙ্গে আশ্চর্য মিল। দন্ত্যস রওশনের অণুকাব্যের আমি একজন মুগ্ধ পাঠক। বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁর অণুকাব্য আমার মতো বহু পাঠককে আকৃষ্ট করে রেখেছে। সঠিক শব্দের ব্যবহার করে দারুণ হাস্য-কৌতুক মিশিয়ে দুই লাইন, চার লাইন কিংবা ছয় লাইনের মধ্যে চমৎকার বক্তব্য তুলে ধরেন রওশন। আমাদের প্রতিদিনের জীবন, মনমানসিকতা এবং চিন্তাভাবনার পরিষ্কার ছাপ ফুটে ওঠে কবিতাগুলোর মধ্যে। একবার পড়তে শুরু করলে পাঠক নিশ্চিত আটকে যাবে রওশনের অণুকাব্যের জালে। যে জাল ছিঁড়ে বেরোনো খুব মুশকিল। ব্যক্তি রওশনের বাচনভঙ্গি, জীবনচারণ ও জীবনদর্শন তাঁর অণুকাব্যে ঝলমল করে ওঠে। ঠাট্টার ছলে দু-চার লাইনের কবিতার মধ্য দিয়ে আমাদের সময়টাকে দেখিয়ে দেন তিনি। সে সময় ও জীবন আমরা যাপন করি, সেই সময় ও জীবনের ছবি তাঁর অণুকাব্যের ফ্রেমে নিয়তই বাঁধা পড়ছে। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সমাজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো হাস্যরস ও কৌতুকের মধ্য দিয়ে তুলে ধরার বিরল ক্ষমতা রাখেন দন্ত্যস রওশন। যত দিন যাবে এই ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে তাঁর। অণুকাব্যের জগতে তিনি একক কৃতিত্বের অধিকারী হবেন, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। প্রিয় রওশন, ‘তোমার অণুকাব্য লেখার কলমটির কালি যেন কখনো ফুরিয়ে না যায়। তোমার দেখার চোখ এবং লেখার ক্ষমতা প্রতিদিন যেন অতিক্রম করে আগের দন্ত্যস রওশনকে। তোমার জন্য এই আমার কামনা।

ডা. মোহিত কামাল

ডা. মোহিত কামাল

মহাকাব্যের জনক হচ্ছেন কবি কায়কোবাদ। মুন্সিগঞ্জে তাঁর বাড়ি। অণুকাব্যের জনক হচ্ছেন দন্ত্যস রওশন, তাঁর বাড়ি নবাবগঞ্জ। মহা আর অণু’র মধ্যে সংযোগ সাঁকো তৈরি করেছেন দন্ত্যস রওশন। অণু’র মধ্য দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে মহাভাবতরঙ্গের। ক্ষদ্রতম অণুকথায় প্রকাশ পায় বিস্তৃত ভাবের উচ্ছাস। অণুশব্দের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় ভাবের হিমালয় সমান উঁচু পাহাড় । সমসাময়িক প্রজন্ম মূল্য দিয়ে চায় না, মূল্য বুঝতে পারে না, বা অন্যের সৃষ্ট মূল্যবান মানিকরতন লুকিয়ে রাখতে চায় সহজাত ঈর্ষা ও হিংসার গোপন ও অদৃশ্য তাড়না নিভিয়ে রাখে মহাআবিষ্কারের আলোকশিখা। সময় গড়িয়ে গেলে, কালোত্তীর্ণ সময়ে কোনো এক মেধাবী প্রজন্ম হিংসা ও ঈর্ষার শক্ত আভরণ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে; মেলে ধরবে অণুর ভিতের ওপর গড়ে ওঠা মহাজাগতিক জৌতির্ম্ময় আলো। অণুকাব্যের মুল্যায়নে এ বিশ্বাস লালন করি সমসাময়িককালেই। অণুর মাধ্যমে মহাসৃষ্টির এমন নজির নেই বিশ্বসাহিত্যে। সমালোচকরা হয়তো ভাববেন, ঘনিষ্টজনের এই কাব্য-বিশ্লেষণে আবেগপ্রবণ কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছি । যে যায় মতো করে ভাবতে পারেন; তবে সব ভাবনার উর্ধ্বে এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায় এটি কেবল আবেগতারিত ব্যবচ্ছেদ নয়, এখানে রয়েছে আবেগবর্জিত চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ। দৈনন্দিন জীবনের টুকরো ধারণা, অনুভূতি, চিন্তা এবং নতুন বোধ কল্পলোকে ছড়িয়ে ব্যাপক উল্লাস তৈরি করার মনন ও সৃজন ক্ষমতার সত্য প্রকাশ রয়েছে অণুকাব্যে। নতুন এ কাব্যধারায় শব্দের গাঁথুনিতে সেই উল্লাস অনুভব করি একজন সচেতন পাঠক হিসেবে। দেখার সুযোগ পাই ছোট্ট কথায় মধ্যে ব্যাপক সৃজনশীলও মননশীল চর্চার বিস্তার। অণুকাব্যের জনক দন্ত্যস রওশন ভবিষ্যতেও এই কাব্যধারা ধরে রাখবেন বলেই বিশ্বাস রাখি।