অণুগল্প ফুটপাত

নীলক্ষেতের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। একা। একটু মনে হয় আনমনা ছিলাম। হঠাৎ গায়ে গায়ে ঘেঁষা লাগলো একজনের সঙ্গে। তাকিয়ে দেখি, একজন তরুণী। মুখে আমার তুবরি ছুটল, স্যরি স্যরি। অনেকবার বলা হল কথাটা। আমি খেয়াল করিনি, মেয়েটাও অনবরত বলে যাচ্ছে, স্যরি স্যরি।
আমরা দুজনে দুদিকে হাঁটা শুরু করি। সে একবার পিছনে ফিরে তাকায়। একবার আমিও ফিরে তাকাই।
দুবছর পরের কথা।
একই বাসায় থাকি। একই ছাদের নিচে। সেই মেয়েটি এখন আমার স্ত্রী। অথবা আমি তার স্বামী।
খুব ছোট বাসা। গায়ে গায়ে ঘেঁষা লাগেই। তবে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগলেও আমরা পরস্পরকে কেউ কিছু বলি না। স্যরি তো দূরের কথা, মুখ তুলেও কেউ কারো দিকে তাকাই না।
নীলক্ষেতের ফুটপাতের কথা খুব মনে পড়ে আজ।
ইস, আমাদের ছোট্ট বাসায় যদি একটা ফুটপাত থাকতো!

আমি ক্লাস সিক্স

পড়ার টেবিল থেকে আম্মুকে দেখা যাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আম্মু বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে দিতে আম্মু বলে, ‘বাপী, তুই কি এক ঘণ্টার জন্য বাসায় একা থাকতে পারবি না?’

‘আম্মু, আমি এখন ক্লাস সিক্স। আমাকে বেবি ভাবছ কেন? খুব পারব।’

আম্মু হাসে।
তুই তাহলে বড় হয়েছিস?
নিশ্চয়। আমি এখন অনেক বড়। লম্বায় বাবার সুমান।
আম্মু মিটমিট করে হাসে এবার। বলে, সুমান না বাবা। বল, সুমান।
নিজেকে দেখতে দেখতে আম্মু আবৃত্তি করেন।
আজিএ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আধারে
প্রভাত পাখির গান… Continue reading

পাখির ডানায় রোদ

পথের পাশেই তুমুলের ক্লাস। জানালা দিয়ে রাস্তার সব কিছুই দেখা যায়। ভয় শুধু টিচারের।

‘অ্যাই ছেলে, জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকিস কেন?’ টিচারের এ কথায় তুমুল লজ্জা পায়। চোখ ঘুরিয়ে নিতে হয় তাকে।

জানালার বাইরে বড় বড় গাছ। গাছের পাশ ঘেঁষেই রাস্তা। নানা ধরনের লোক চলাচল করে। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভালো লাগে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে এমন হয় যে মাঝে মাঝেই সে অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

একদিন সে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। এ দৃশ্য দেখে তার ইংরেজির টিচার চুপি চুপি তার সামনে একটি সাদা খাতা মেলে ধরেন। বলে, ‘তুই তো কবি হয়ে গেছিস রে। নে, লেকচার শোনা বাদ দিয়ে কবিতা লেখ। আর জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাক।’ টিচারের কথা শুনে ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। তবে তুমুলের বন্ধু সৌধ হাসতে পারে না। সে বলে, ‘ও কিন্তু সত্যি কবি। কবিতা লেখে। ওর ব্যাগের ভিতর একটা কবিতার খাতা আছে। অনেকগুলো কবিতা লিখেছে।’ স্যার সৌধের কথা শুনে কৌতূহলী হন। ‘দেখি, দেখি। বার করত কবিতার খাতাটা।’ Continue reading

আমার বন্ধুর বোন

বেশ কয়েক দিন থেকেই দেখছি, রাশাদ আমাকে এড়িয়ে চলছে৷ কিন্তু কেন? আমি তার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না৷ ১২টায় আমাদের কোনো ক্লাস থাকে না৷ সেই সময়টায় সাধারণত আমরা ক্যানটিনে আড্ডা দিই৷ সেই আড্ডার স্থায়ী মেম্বার ছিল রাশাদ৷ শুধু তা-ই নয়, সে আমার ছোটবেলার বন্ধুও বটে৷
আজও রাশাদ এসেছিল ক্যানটিনে৷ কিন্তু আলাদা টেবিলে বসেছিল৷ বারকয়েক আমার দিকে তাকিয়েছে৷ আমিও না-দেখার ভান করেছি৷ ব্যাপারটা খুলে বলি আরমানকে৷ সে সব শুনে বলে, ‘আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের কর৷ তার পর সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে৷’ আমি বলি, ‘খুঁজে বের করার কী আছে৷ আমার তো অসংখ্য মেয়ে বন্ধু৷’ আরমান বলে, ‘ওসব না৷ বিশেষ একজন আছে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ সে হয়তো তোকে বাসে৷ তুইও তাকে বাসিস৷’
উপমার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘এই, তুই কি আমাকে বাসিস?’
উপমা চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, ‘বাসিস আবার কেমন কথা?’
আমি আরমানকে দেখিয়ে বলি, ‘এটা আমার কথা নয়৷ আরমান বলেছে৷’
‘তোতা পাখির মতো পরের বুলি না বললেই পারিস৷’ Continue reading

আরও দুইজন বাকি

নাজিমুদ্দির বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে পাকাপাকি পাকা রাস্তা হয়ে গেল। মাস খানেক আগে এলাকার সাংসদ এসে লাল ফিতা কেটে রাস্তা উদ্বোধন করে গেছেন। শুরু হয়েছে গাড়ি চলাচল। নাজিমুদ্দির মা আশি বছরের বৃদ্ধা। উঠোনে বসে থাকেন। চোখে ঝাপসা দেখেন। হাতে ভর দিয়ে হাঁটার লাঠি।
দাদির কাছে দৌড়ে এসে ১২ বছরের নাতি জুয়েল বলে, ‘দাদি, আইজকা চাইড্ডা বাস, পাঁচডা  টেম্পো আর একডা নছিমন গেল রাস্তা দিয়া।’
নছিমনের কথা শুনলেই দাদির মনটা খারাপ হয়ে যায়। ‘গাড়ির নাম আবার নছিমন হয় কীভাবে?’ তাঁর নিজের নামও নছিমন বিবি। সে জন্যই হয়তো বিষয়টা তাঁর ভালো লাগে না।
জুয়েল রাস্তার ধার থেকে দৌড়ে আসে হাঁপাতে হাঁপাতে। ‘মা, তাড়াতাড়ি আসো, আমাগো বাঁশ কাইট্টা ফালাইল।’ মা-ছেলে দৌড়ে যায় বাঁশঝাড়ের কাছে। অল্প সময়ের মধ্যে দুটো বাঁশের মাথা কেটে ফেলেছে টেম্পোচালক আজিম। আরেকটা বাঁশের মাথায় দা দিয়ে কোপ দিতেই জুয়েলের মা আনিছা চিৎকার করে ওঠেন, ‘খবরদার। আর একটা কোপ দেও যদি, আমি তুমার টেম্পো কোপানো শুরু করব।’ কথা শুনে হকচকিয়ে যায় আজিম। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে জুয়েলের মায়ের হাতে চকচকে ধারালো দা।
আজিম বলে, ‘কইছিলাম কি, তুমার গিয়া, আপনের বাঁশ তো হেইলা পড়ছে। গাড়ির পেসেঞ্জারগো অসুবিধা হয়।’
‘পেসেঞ্জারগো অসুবিধা হয়, আমার বাঁশ আমি কাটুম। তুই কাটার কেডা। যা, তাড়াতাড়ি টেম্পো স্টাট দে।’
টেম্পোচালক আজিম আর কোনো কথা না বলে খালি টেম্পো স্টার্ট দিয়ে ধুলাধোঁয়া উড়িয়ে চলে যায় বাজারের দিকে।
জুয়েল এ ঘটনা সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে নিজেও মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে অবাক। মা যে এতটা রাগতে পারে, জুয়েলের ভাবনায় ছিল না। সে দৌড়ে এসে উঠোনে দাদির হাতের লাঠি ধরে বলে, ‘দাদি, মায় তো আগুন হইছে।’
‘আগুন হইছে ক্যান?’ দাদির কাছে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে জুয়েল।
দাদি শুনে বলে, ‘ঠিক কাম করছে। আর তুই কী করলি? তুই খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামশা দেখলি?’
‘দাদি, আমি তো এহনও ছোট।’
‘ছোট হও আর যা-ই হও, বাপের মতো উদাসীন হইয়ো না।’
জুয়েলের বাবা উদাসীনই বটে। ঘর-সংসারের খুব একটা খোঁজ নেন না। শুধু গান গেয়ে বেড়ান। লালন-অন্তঃপ্রাণ। ফকির লালন শাহর গান খুব ভালো গাইতে পারেন। সেই গান নিয়েই তাঁর ঘর-সংসার। সংসার কীভাবে চলে তিনি আসলে খুব ভালো করে জানেন না।
এই কয়েক দিন আগের কথা। ঘরে চাল-ডাল কিছু নেই। জুয়েলের মা ক্ষিপ্ত হয়ে নাজিমুদ্দিকে বলেন, ‘তুমার মাথায় একটা বাড়ি দেওন দরকার।’
জুয়েলের বাবা নাজিমুদ্দি হাসেন। বলেন, ‘এত ট্যাকা খরচ করন দরকার নাই।’
‘তার মানে?’
‘তার মানে আবার কী। মাথা ফাটলে হাসপাতালে নিতে অইব না?’
কথা শুনে আনিছার যেন গা জ্বলে যায়। তিনি দপদপ করে পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে যান।
এক হাজার কালো মোষ যেন জমিন থেকে ওঠে গেছে আকাশে। কালো মেঘ হয়ে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকেলবেলাই সন্ধ্যা নেমে এল নতুন চন্দ্রপুর গ্রামে। সন্ধ্যা হয়েছে, ভুল করে বাঁশঝাড়ে উড়ে এসে বসল কিছু সাদা বক পাখি।
‘দাদি, দেখো, বক পাখি আইছে,’ জুয়েল বলে।
‘তোর কি মনে থাকে না আমি চোখে দেহি না?’
কথা শুনে জুয়েলের খুব কষ্ট হয়। ইশ্, দাদি যদি বক পাখি দেখত!
দোতারা নিয়ে ঘর থেকে বের হন নাজিমুদ্দি। জুয়েল দাদির কানে কানে বলে, ‘দাদি, বাবা যাইতাছে।’ দাদি লাঠি নাড়তে নাড়তে বলেন, ‘কুথায় গান গাইতে যাস। কবে ফিরবি?’
‘কাইল সক্কালে ফিরা আসুম, মা।’
পেছন থেকে আনিছা বলেন, ‘লালনের মাজারে পইড়া থাকলেই তো হয়। ফিরা আসন দরকার কী।’
কথা শুনে নাজিমুদ্দি হাসেন। হাসি দেখে গা জ্বালা করে ওঠে আনিছার। বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে হেঁটে যান নাজিমুদ্দি।

রাত বারোটা-একটা হবে। গভীর ঘুমে অচেতন নতুন কৃষ্ণপুর গ্রাম।
হঠাৎ সাদা বকের কক্কক্ শব্দে হালকা ঘুম ভাঙে জুয়েলের। মনে হয়, বাঁশঝাড়ের নিচে কারও পায়ের শব্দ। জুয়েল এমনিতে দাদির গা ঘেঁষে শোয়। পায়ের শব্দ পেয়ে দাদির পিঠের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে ঘুমিয়ে গেল। মা পাশের ঘরে। মাঝখানে মুলিবাঁশের বেড়া। মা-ও গভীর ঘুমে।
আবার ঘুম ভাঙে জুয়েলের। কারা যেন ফিসফিস করছে। না, কেউ না। জুয়েল মনে মনে বলে।
আবার ঘুমোতে চেষ্টা করে।
আবার ফিসফিসানি। লোকজনের পায়ের শব্দ। মনে হয় পাশের ঘরেই যেন।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। তিনজন লোক মায়ের মুখে একটি গামছা বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে জুয়েল।
বাঁশঝাড়ের দু-একটি সাদা বক আকাশে উড়াল দেয়। আনিছাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে তিনজন। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই দৌড়াচ্ছে জুয়েল। তিনজন লোক আনিছাকে একটি গাছের নিচে শুইয়ে ফেলে।
ঠিক তখনই জুয়েল মায়ের ধারালো দা দিয়ে পেছনে দিক থেকে একজনের পিঠে কোপ বসিয়ে দেয়। ফিনকি দিয়ে তার পিঠ থেকে রক্ত বের হতে থাকে। লোকটা পেছনে মুখ ঘোরাতেই জুয়েল বুঝতে পারে, লোকটা টেম্পোচালক আজিম।
বাকি দুজন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে যেন। ইতিমধ্যে আনিছা উঠে দাঁড়িয়েছেন। আর ধারালো দা নিয়ে দ্বিতীয়জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জুয়েল।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা দুজনেরই যেন হুঁশ হলো। তারা পড়িমরি করে দৌড়াতে থাকল বাজারের দিকে। জুয়েল মায়ের হাত ধরে বাজারের দিকেই দৌড়াতে থাকে।
আনিছা হাঁপাচ্ছেন। সামান্য থেমে বলেন, ‘বাজান, চল বাড়ি যাই।’
‘না, মা আরও দুইজন বাকি আছে।’

ক্যাম্পাসের কবি

আমরা প্রায়ই শুনতাম, রাতুল সদরঘাটে যায়।
জেসমিন বলল, ‘কেন,  ঘোলা পানি দেখতে?’
ইকবাল বলে, ‘হ্যাঁ, ক্যাম্পাসে তো ঘোলা পানি নেই, তাই যায়।’ বুবন কথা শুনে খিলখিল করে হাসতে শুরু করে। আমি একটু গম্ভীর হয়ে বলার চেষ্টা করি, ‘ও আসলে কবিতা লেখে তো, তাই। নদীটদী দেখতে যায়।’ Continue reading